Back to Blog

হাইওয়েতে ওঠার জন্য আপনি যখন জোরে এক্সিলারেটর চাপলেন, ঠিক তখনই হাতের স্টিয়ারিং হুইলটা থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। মনে হচ্ছে যেন পুরো গাড়িটাই প্রচণ্ডভাবে কাঁপছে। অনেকেই ধারণা করেন "সম্ভবত টায়ারের সমস্যা।"

এই ধারণাটা কিন্তু বিপজ্জনক হতে পারে। টায়ারের সমস্যা সাধারণ হলেও, গাড়ি যখন hard acceleration এ থাকে তখন এই কাঁপুনি হলো একটি সতর্কবার্তা। যার অর্থ আপনার গাড়ির কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অতিরিক্ত লোড নিতে পারছে না। একে অবহেলা করা মানে বড় ধরনের এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল দুর্ঘটনার দিকে ধাবিত হওয়া।

সাধারণ ধারণাগুলো অনেক সময় ভুল হয়

বেশিরভাগ চালকই শুরুতে হুইল ব্যালেন্সের কথা ভাবেন। সাধারণত চাকার ব্যালেন্স ঠিক না থাকলে গাড়ি যখন একটি নির্দিষ্ট গতিতে (যেমন ঘণ্টায় ১০০ কিমি) চলতে থাকে, তখন কাঁপুনি দেয় এবং গতি কমালে বা বাড়ালে তা চলে যায়। কিন্তু যদি কাঁপুনিটা শুধু তখনই হয় যখন আপনি ইঞ্জিনে পাওয়ার দিচ্ছেন বা জোরে এক্সিলারেটর চাপছেন, তবে বুঝতে হবে সমস্যাটি সরাসরি ড্রাইভট্রেন (Drivetrain) ব্যবস্থায়।

ড্রাইভট্রেন হলো সেই সিস্টেম যা ইঞ্জিন থেকে চাকা পর্যন্ত শক্তি পৌঁছে দেয়। আপনি যখন জোরে এক্সিলারেটর চাপেন, তখন এই সিস্টেমের ওপর সর্বোচ্চ টর্ক বা চাপ পড়ে। ড্রাইভট্রেনের যেকোনো দুর্বল বা ক্ষয়ে যাওয়া অংশ তখনই এই কাঁপুনির মাধ্যমে জানান দেয়। মূল বিষয় হলো এই কাঁপুনি ঠিক কোথায় হচ্ছে এবং কখন হচ্ছে, তা লক্ষ্য করা।

কাঁপুনি কোথায় হচ্ছে? আপনার প্রাথমিক রোগনির্ণয়

টাকা খরচ করার আগে নিজেই খুব সহজে প্রাথমিক পরীক্ষাটি করে নিতে পারেন। খেয়াল করুন কাঁপুনিটা কোথায় সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে:

  • স্টিয়ারিং হুইল এবং সামনের মেঝেতে কাঁপুনি এটি নির্দেশ করে যে সমস্যাটি আপনার গাড়ির সামনের এক্সেল (front axle)-এ। সাধারণত সিভি জয়েন্ট (CV axles) ক্ষয়ে গেলে বা সামনের চাকার বেয়ারিং নষ্ট হয়ে গেলে এমন হয়। সিভি জয়েন্ট নষ্ট হলে গাড়ি ঘোরানোর সময় সাধারণত 'খটখট' শব্দ হয়, তবে জোরে এক্সিলারেটর চাপলে এগুলো সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে থরথর করে কাঁপতে থাকে।
  • সিট বা পেছনের মেঝেতে কাঁপুনি: এটি পেছনের ড্রাইভট্রেনের সমস্যার একটি লক্ষণ। আপনার নজর দেওয়া উচিত ড্রাইভশ্যাফট (driveshaft), পেছনের এক্সেল, ডিফারেনশিয়াল (differential) বা পেছনের চাকার বেয়ারিংয়ের দিকে। এখান থেকেই আসল আশঙ্কাজনক সত্য বেরিয়ে আসে।

যে সমস্যাগুলো মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়

যখন কাঁপুনিটা accelaration এর সময় পেছন থেকে আসে, তার মানে আপনি অনেক বেশি চাপের এবং দামী পার্টস নিয়ে কারবার করছেন। চলুন সেগুলো বিস্তারিত জেনে নিই:

  1. ক্ষয়ে যাওয়া বা আনব্যালেন্সড ড্রাইভশ্যাফট এটি এই সমস্যার প্রধান সন্দেহভাজন। ড্রাইভশ্যাফট হলো একটি ঘূর্ণায়মান টিউব যা ট্রান্সমিশনকে ডিফারেনশিয়ালের সাথে যুক্ত করে। প্রচণ্ড চাপের সময় দুটি জিনিস হতে পারে। প্রথমত, ড্রাইভশ্যাফটের ব্যালেন্স নষ্ট হতে পারে। দ্বিতীয়ত এবং আরও আশঙ্কাজনক হলো, এর দুই প্রান্তের 'ইউনিভার্সাল জয়েন্ট' বা ইউ-জয়েন্ট (U-joints) ক্ষয়ে যাওয়া। একটি ক্ষয়ে যাওয়া ইউ-জয়েন্ট মসৃণভাবে ঘুরতে পারে না। ফলে আপনি যখন এক্সিলারেট করেন, পুরো গাড়িতে এমন এক তীব্র ঝাঁকুনি তৈরি হয় যে মনে হয় গাড়িটি ভেঙে পড়বে। ইউ-জয়েন্ট পুরোপুরি নষ্ট হয়ে খুলে গেলে ড্রাইভশ্যাফট নিচে পড়ে যেতে পারে এবং আপনি তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তার মাঝখানে আটকা পড়বেন।
  2. ইঞ্জিন বা ট্রান্সমিশন মাউন্ট নষ্ট হওয়া এই সমস্যাটি আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই। 'মাউন্ট' হলো রাবার এবং ধাতুর তৈরি ব্র্যাকেট যা ইঞ্জিন এবং ট্রান্সমিশনকে যথাস্থানে আটকে রাখে। এদের কাজ হলো কম্পন শুষে নেওয়া। এগুলো ফেটে গেলে ইঞ্জিন আর স্থির থাকতে পারে না। সাধারণ ড্রাইভিংয়ের সময় হয়তো খুব সামান্য কাঁপুনি বোঝা যায়, কিন্তু জোরে এক্সিলারেটর চাপলে ইঞ্জিন প্রচণ্ড শক্তিতে নড়ে ওঠে। মাউন্ট ভাঙা থাকলে ইঞ্জিন অতিরিক্ত নড়েচড়ে উঠে থ্রোটল বা ড্রাইভট্রেনে টান দিতে পারে, ফলে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি বা শব্দ হতে পারে। রিভার্স থেকে ড্রাইভ মোডে দেওয়ার সময় যদি জোরে 'ধুপ' করে শব্দ শোনেন, তবে বুঝবেন সমস্যাটি এখানেই।
  3. ইন্টারনাল ডিফারেনশিয়াল বা এক্সেল সমস্যা এটি বেশ গুরুতর বিষয়। ডিফারেনশিয়াল আপনার চাকাগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন গতিতে ঘুরতে সাহায্য করে। এর ভেতরের বেয়ারিং বা গিয়ার ক্ষয়ে গেলে সাইঁ সাইঁ শব্দ হতে পারে এবং গাড়িতে চাপ বাড়লে কাঁপুনিও বাড়ে। একইভাবে, একটি বাঁকা রিয়ার এক্সেলও এক্সিলারেশনের সময় সমস্যা করতে পারে। এগুলো নিজে নিজে ঠিক করার চেষ্টা করবেন না; এর জন্য পেশাদার মেকানিকের প্রয়োজন এবং খরচও কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

যেভাবে বিশেষজ্ঞের মতো রোগনির্ণয় করবেন

  • টায়ার পরীক্ষা টায়ারের কোথাও ফুলে গেছে কিনা বা থ্রেড উঠে গেছে কিনা দেখুন। টায়ারের বেল্ট সরে গেলেও লোড পড়লে কাঁপতে পারে।
  • নিচের অংশ পর্যবেক্ষণ: গাড়িটি সাবধানে উপরে তুলে বা নিচ দিয়ে লক্ষ্য করুন (অবশ্যই শক্ত স্ট্যান্ড ব্যবহার করবেন, শুধু জ্যাকের ওপর ভরসা করবেন না)। আপনার পরিচিত কাউকে ড্রাইভে রেখে হালকা এক্সিলারেটর দিতে বলুন। দেখুন ড্রাইভশ্যাফট ঘোরার সময় দুলছে কিনা বা ইউ-জয়েন্টের চারপাশে গ্রিজ ছিটকে পড়ে আছে কিনা। মরিচা বা গ্রিজ মানেই হলো জয়েন্টটি নষ্ট হতে শুরু করেছে। হাত দিয়ে ড্রাইভশ্যাফট নাড়ানোর চেষ্টা করুন; ইউ-জয়েন্টে কোনো রকম নড়াচড়া থাকা উচিত নয়।
  • ইঞ্জিন মাউন্ট চেক করুন: ইঞ্জিন বন্ধ করে ফ্ল্যাশলাইট দিয়ে মাউন্টগুলো দেখুন। রাবারগুলো ফেটে গেছে কিনা বা ইঞ্জিন অয়েলে ভিজে নষ্ট হয়েছে কিনা লক্ষ্য করুন। ইঞ্জিন চালু অবস্থায় কাউকে হালকা রেভ (Rev) করতে বলুন, যদি দেখেন ইঞ্জিন অতিরিক্ত লাফাচ্ছে, তবে মাউন্ট পাল্টাতে হবে।

কখন গাড়ি চালানো বন্ধ করে মেকানিক ডাকবেন?

যদি কাঁপুনি খুব তীব্র হয় এবং তার সাথে প্রচণ্ড শব্দ) শোনা যায়, তবে গাড়িটি আর চালাবেন না। এর মানে হলো ইউ-জয়েন্ট বা সিভি জয়েন্ট যেকোনো মুহূর্তে পুরোপুরি ভেঙে যেতে পারে। রাস্তার মাঝখানে ড্রাইভশ্যাফট খুলে পড়ে গিয়ে বড় দুর্ঘটনার চেয়ে গাড়িটি টোয়িং (Towing) করে গ্যারেজে নেওয়া অনেক সস্তা।

শেষ কথা

জোরে এক্সিলারেটর দেওয়ার সময় গাড়িতে কাঁপুনি হওয়াটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। আপনার গাড়ি তার নিজের ভাষায় আপনাকে বলছে যে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে যাওয়ার পথে। সময়মতো মেরামত করুন, আপনার নিরাপত্তা এবং অর্থ দুই-ই বেঁচে যাবে।

Technical team - Khidmah Automobile